ডিআইজি মোল্যা নজরুলের টাকাই ছিল শেষ কথা
পুলিশের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের একজন ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলামের কাছে টাকাই ছিল শেষ কথা। বিগত ১৫ বছর তিনি যেখানেই পোস্টিং পেয়েছেন, সেখানেই জমি দখল, বাড়ি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বিতর্কিত হয়েছেন। টাকার জন্য আওয়ামী লীগবিরোধী নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের নানা ফাঁদে ফেলে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এমন কী তিনি ২০১৮ সালে দেশের গুণী কণ্ঠশিল্পী বাংলাগানের যুবরাজ আসিফ আকবরকেও গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেল খাটান। তেমনি তার রোষানলে পড়ে আরও অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় মোল্যা নজরুল ইসলাম কোটি টাকার ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পান দুদক থেকে। অবৈধ ক্ষমতার প্রভাবে বার বার নানা বিতর্কিত কর্মকা-ে জড়িয়েও পতিত সরকারের আমলে পার পেয়ে যান। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের আস্থাভাজন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পাননি পুলিশের শীর্ষ কর্তারা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় এপিবিএনের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েকটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়। পরে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সংযুক্ত করা হয় তাকে। রবিবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিক্ষার্থী ফাহিম হোসেন জুবায়েদ হত্যাচেষ্টার মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার হিসেবে ২০২২ সালের ৩০ জুন নিয়োগ পান ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনার পদ পেতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে তিনি ৫ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন। জিএমপি কমিশনার হওয়ার পর মোল্যা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করার পাশাপাশি বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধারে অসহযোগিতা করার অভিযোগও ওঠে। গাজীপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে এমন অভিযোগ করেন। দুদকে জমা পড়া অভিযোগের সারসংক্ষেপে বলা হয়- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের ফার্মগেটের বাসায় ঘুষের এই টাকা হস্তান্তর করেন তিনি।
এদিকে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গাজীপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এক চিঠিতে জানান, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশে কমিশনার হিসেবে মোল্যা নজরুল ইসলামের যোগদানের পর থেকে খাসজমি দখল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পুলিশের অসহযোগিতার কারণে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওই চিঠিতে জেলা প্রশাসক অভিযোগ করেন, গাজীপুর মহানগর পুলিশ টঙ্গী মৌজায় টঙ্গী হাট বা বাজারের আওতাভুক্ত শূন্য দশমিক ১৮ একর খাসজমি বিভিন্ন সময়ে দখল করে ‘গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ মার্কেট’ নামে একটি মার্কেট বানিয়েছে। তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি), টঙ্গী রাজস্ব সার্কেল দপ্তরের কানুনগো ও সার্ভেয়ারের সরেজমিন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে চিঠিতে বলেন, গাজীপুর মহানগর পুলিশ দখল করা জমির একাংশে একটি নামাজঘর এবং বাকি অংশে ৬০টি দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে।
২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর (উত্তর) গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডিসি থাকা অবস্থায় মোল্যা নজরুলের টিম আবিদুল হক নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে তার ব্যাংকের হিসাব থেকে কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য ওই ব্যাংকের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর ডিবির উত্তর বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলামকে সেখান থেকে সরিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় ডিবির উত্তর বিভাগের সাবেক পরিদর্শক আজহারুল ইসলাম ও এসআই হাসনাত খন্দকারকে প্রত্যাহার করা হয়।
এ ঘটনার পর নড়াইল এলাকার তৎকালীন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য কবিরুল হক নিজস্ব প্যাডে মোল্যা নজরুলের নেতৃত্বে ঘুষ নেওয়ার লিখিত অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগপত্রের অনুলিপি দেন। অভিযোগকারী ব্যবসায়ী আবিদুল হক তৎকালীন এমপি কবিরুল হকের আত্মীয়। ঘুষ কেলেঙ্কারির বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে পুলিশ বিভাগসহ সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। তবে এই ঘটনায় ২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর মোল্যা নজরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে মামলার অনুমোদন দেয় দুদক। তখন দুদক জানায়, ‘ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের সঙ্গে মোল্যা নজরুলের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকায় তাকে আসামি করা হয়নি।’ ওই সময় দুদকের উপ-পরিচালক নাসিম আনোয়ার বাদী হয়ে দুই এসআইয়ের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করেন। তখন আসামি করা হয় তৎকালীন ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল হাসনাত খন্দকার ও বংশাল থানার এসআই মো. জুয়েল মিয়াকে।
মোল্যা নজরুল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি থাকা অবস্থায় অবৈধ ভিওআইপি বিরোধী অভিযানের নামে লাখ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন করতেন। আর ঘুষের বিনিময়ে ছেড়েও দিতেন। এমন কী, অভিযানে যেসব যন্ত্রপাতি উদ্ধার হতো তা আবার মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করে দিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ বিরোধী মতের লোকজনকে ধরে এনে ব্যাপক নির্যাতন করারও অভিযোগ রয়েছে। সিআইডিতে বিশেষ পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোল্যা নজরুল ইসলাম মানব পাচারকারী চক্রের কাছ থেকেও মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিসিএস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করেও তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দেওয়ায় মিথ্যা মামলা করে একজন ব্যবসায়ীকে ছয় মাস জেলও খাটান মোল্যা নজরুল ইসলাম। জয়পুরহাট জেলায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালনকালেও জমি দখলসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গাজীপুরের একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত ৮ জানুয়ারি মোল্যা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হয়।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা হওয়ায় মোল্যা নজরুল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাত্তা দিতেন না। অনেকের সঙ্গেই খারাপ আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্পাদক ও প্রকাশক
বাংলার আলো মিডিয়া লিমিটেড
৮৯ বিজয় নগর, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম শরণি, আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেট (৫ম তলা)। ঢাকা-১০০০
নিউজঃ +৮৮ ০১৩৩২৫২৮২৪১ || [email protected] || বিজ্ঞাপণঃ +৮৮ ০১৩৩২৫২৮২৪৩ || [email protected]
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || banglaralo24.com